সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান
  অহংকার মোচন কৃষ্ণনগর(আগরতলা) নিবাসী শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্র কুমার দেববর্মা মহাশয় প্রথম জীবনে বিলোনীয়ায় ত্রিপুরার রাজার নায়েব ছিলেন। কার্যোপলক্ষে তাঁকে বিলোনীয়ায় থাকতে হতো। ঐ সময় তিনি মাঝে মাঝে শ্রীযুক্ত ফনীন্দ্র মালাকার মহাশয়ের বাড়ীতে শ্রীশ্রী রামঠাকুরকে দেখতে যেতেন। একদিন শুনলেন যে শ্রীশ্রী রামঠাকুর শ্রীযুক্ত ফনীন্দ্র মালাকার মহাশয়ের বাড়ী হতে পাল্কী যোগে রেল স্টেশনে যাবেন। তিনি স্থির করলেন যে তিনি পাল্কীর পেছনের দিকে একা বহন করবেন। যেহেতু তিনি যুবক এবং শক্তিমান। আর সামনের দিকে দু'জন বহন করবে। এই সিদ্ধান্তই বাস্তবে কার্যকরী হল। যথাসময়ে পাল্কী চলতে আরম্ভ করল। শ্রীশ্রী রামঠাকুর একাই ঐ পাল্কীতে বসে আছেন। কিন্তু দেখা গেল যে পাল্কীর পেছনের দিক এত ভারী বোধ হল যেন তাঁর কোমর ভেঙ্গে যাবে। তিনি লজ্জায় বলতে সাহস পেলেন না। হঠাত তাঁর মনে হলো তাঁর শারীরিক শক্তির অহংকার ত্যাগ করে শ্রীশ্রী রামঠাকুরের কৃপা প্রার্থনা করা প্রয়োজন। পরে তাই করলেন। দেখা গেল যে পেছনের দিক শোলার মতো হালকা বোধ হল। ফলে আরামে রেল স্টেশনে পৌঁছে গেলেন। শ্রীশ্রী রামঠাকুর তাঁর শরনাগতের অহংকার মোচন করেন। ভগবান প্রাপ্তিতে অহংকার বির...

নশ্বর মানব দেহ ও নাম স্মরণের মাধ্যমে মুক্তি ভূমিকা (Intro)

 

নশ্বর মানব দেহ ও নাম স্মরণের মাধ্যমে মুক্তি

ভূমিকা (Intro)

শ্রী শ্রী রামঠাকুরের এই উপদেশটি মানুষের দেহ ও জীবনের অস্থায়ীত্ব এবং মুক্তি লাভের উপায় নিয়ে রচিত। তিনি এই নশ্বর জগৎকে একটি যাত্রাপথের সাথে তুলনা করেছেন যেখানে কেবল আগমন ও প্রস্থান ঘটে, কিন্তু স্থিতি বা স্থায়িত্ব বলে কিছু নেই। এই চরম সত্যকে উপলব্ধি করে একমাত্র নাম-স্মরণের মাধ্যমেই জন্ম-মৃত্যুর ভয়াবহ চক্র থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব, এটিই বাণীর মূল সুর।


মূল পাঠ্য বিশ্লেষণ (Main Script Explanation Point to Points)

উপদেশটির মূল ভাবনাগুলিকে কয়েকটি প্রধান অংশে ভাগ করে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. দেহের অস্থায়ীত্ব ও মরভূমি: * বাণী: "চিরস্থায়ী এই দেহ নহে বলিয়াই ইহাকে মরভূম বলিয়া থাকে।" * ব্যাখ্যা: মানব দেহটি চিরস্থায়ী নয়, ক্ষণস্থায়ী। এই কারণে দেহকে এবং এই জগৎকে "মরভূম" (মরণশীলদের ভূমি বা যেখানে মৃত্যু অনিবার্য) বলা হয়েছে। এখানে জীবন ক্ষণিকের, স্থায়িত্বহীন।

২. স্থিতিহীন আগমন ও প্রস্থান: * বাণী: "কেবল আগমপায়ী [আগমন-প্রয়াণকারী] আসে আর যায়, স্থিতি নাই।" * ব্যাখ্যা: এই পৃথিবীতে সবাই আগন্তুক। কেবল মানুষ আসে (জন্ম নেয়) এবং যায় (মৃত্যুবরণ করে)। এই আসা-যাওয়ার মধ্যে কোনো স্থায়িত্ব বা চিরন্তন অবস্থান নেই। জীবন একটি চলন্ত প্রবাহ মাত্র।

৩. জন্ম-মৃত্যুর জন্য দুঃখ না করা: * বাণী: "এইজন্য জন্ম-মৃত্যুর জন্য দুঃখ না করিয়া নাম করিতে করিতে দেহত্যাগ হইলেই আর এই মরভৌতিক জগতে জনমে মরণের অধীন হয় না, মুক্তিপদ লাভ করিতে পারে।" * ব্যাখ্যা: যেহেতু দেহের বিনাশ নিশ্চিত, তাই জন্ম বা মৃত্যুর জন্য শোক বা দুঃখ করা অর্থহীন। বরং, যখন দেহত্যাগের সময় আসে, তখন সেই মুহূর্ত পর্যন্ত ভগবানের নাম জপ করতে থাকা উচিত। নাম জপ করতে করতে দেহত্যাগ করলে মানুষ জন্ম-মৃত্যুর অধীন এই নশ্বর জগতে আর ফিরে আসে না—সে মুক্তিপদ বা মোক্ষ লাভ করে।

৪. অনিবার্য দেহত্যাগ: * বাণী: "যখন যাহার সময় হয় তখনই তাহাকে এই দেহজরাপিণ্ড ত্যাগ করিতে হয়।" * ব্যাখ্যা: দেহের বিনাশ অনিবার্য এবং তা সময় মতোই ঘটবে। "দেহজরাপিণ্ড" (জরাগ্রস্ত বা ধ্বংসশীল দেহের সমষ্টি) ত্যাগ করার সময় কারোরই নিজের হাতে নেই, এটি নির্দিষ্ট সময়েই সম্পন্ন হয়।




শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রেক্ষাপটে বিশেষ ব্যাখ্যা (Special Explanation in Respect of Gita)

শ্রী শ্রী রামঠাকুরের এই উপদেশটির সাথে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মূল দর্শনের গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।

১. দেহের নশ্বরতা (অনিত্যতা) এবং আত্মার অবিনশ্বরতা (নিত্যতা)

  • গীতার সার: রামঠাকুরের বাণী দেহের "চিরস্থায়ী নহে" বলার মাধ্যমে গীতার জ্ঞানযোগের প্রথম শিক্ষাকেই তুলে ধরে। গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে (সাংখ্যযোগ) শ্রীকৃষ্ণ বলেন:

    वासांसि जीर्णानि यथा विहाय नवानि गृह्णाति नरोऽपराणि। तथा शरीराणि विहाय जीर्णान्यन्यानि संयाति नवानि देही॥ (২/২২)

    অর্থ: মানুষ যেমন পুরোনো বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র গ্রহণ করে, তেমনই দেহী (আত্মা) জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে অন্য নতুন শরীর গ্রহণ করে।

  • সাদৃশ্য: রামঠাকুর এই দেহকে "মরভূম" বলেছেন, আর গীতা দেহের অনিত্যতাকে প্রতিষ্ঠা করে আত্মাকে অবিনশ্বর ঘোষণা করে। তাই জন্ম-মৃত্যুর জন্য শোক করা উচিত নয়।

২. কর্মফল ত্যাগ এবং মুক্তি (মোক্ষ)

  • গীতার সার: নাম-স্মরণ করতে করতে দেহত্যাগ করার ফলে মুক্তি লাভের কথাটি গীতার কর্মযোগ এবং ভক্তিযোগের ধারণার সাথে সম্পর্কিত। গীতা শিক্ষা দেয় যে, কামনা-বাসনা ত্যাগ করে এবং ঈশ্বরকে সমর্পণ করে কর্ম করলে মানুষ জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে।

    শ্লোক

    যং লব্ধ্বা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ। যস্মিন্ স্থিতো ন দুঃখেন গুরুণাপি বিচাল্যতে॥ (৬/২২)


    বঙ্গানুবাদ

    যাকে লাভ করার পর (যোগী) আর অন্য কোনো লাভকেই তার চেয়ে বেশি বলে মনে করেন না, এবং যাতে (সেই অবস্থায়) সুপ্রতিষ্ঠিত থাকলে তিনি মহাদুঃখ দ্বারাও বিচলিত হন না, (সেই অবস্থাই হলো যোগ)।


    সরল ব্যাখ্যা

    এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যোগের পরাকাষ্ঠা বা পরম সুখের বর্ণনা দিয়েছেন।

    যখন কোনো যোগী বা সাধক সেই পরম আধ্যাত্মিক অবস্থা (আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান) লাভ করেন, তখন তাঁর কাছে জাগতিক অন্য কোনো প্রাপ্তি বা লাভই আর গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। এই অবস্থাটি এতই সুদৃঢ় যে, তাতে একবার স্থির হয়ে গেলে, বড় থেকে বড় দুঃখ বা চরম বিপর্যয়ের আঘাতও তাঁকে তাঁর পথ থেকে বা তাঁর মানসিক শান্তি থেকে বিন্দুমাত্রও টলাতে পারে না। এই স্থিতিই যোগ বা সমাধি অবস্থার পরিচায়ক।

    অর্থ: যা লাভ করার পর এর থেকে আর শ্রেষ্ঠ কোনো লাভ মনে হয় না, এবং যাতে স্থির থাকলে মহাদুঃখের দ্বারাও বিচলিত হতে হয় না—সেই পরমপদই মুক্তি

  • সাদৃশ্য: রামঠাকুরের মতে, নাম করতে করতে দেহত্যাগ করলে "মরভৌতিক জগতে জনমে মরণের অধীন হয় না" অর্থাৎ মুক্তিপদ লাভ হয়। এটি গীতায় বর্ণিত মুক্তি (মোক্ষ) বা ব্রহ্মনির্বাণের সমার্থক। নাম-স্মরণ হলো ভক্তিযোগের একটি প্রধান অঙ্গ, যা মোক্ষের পথ প্রশস্ত করে।

সুতরাং, শ্রী শ্রী রামঠাকুরের এই বাণীটি গীতার অনিত্য দেহ ও নিত্য আত্মার দর্শন এবং কর্ম-ভক্তিযোগের মাধ্যমে মোক্ষ লাভের পথ—এই দুটি মৌলিক ধারণাকে অত্যন্ত সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় মানব সমাজে প্রচার করেছে।   

সমাপ্তি (End Script)

শ্রী শ্রী রামঠাকুরের এই বাণীটি জীবনের চরম লক্ষ্য হিসেবে মুক্তিকে নির্দেশ করে এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের সহজতম পথ হিসাবে নাম-স্মরণ বা নাম জপকে প্রতিষ্ঠা করে। দেহের নশ্বরতাকে মেনে নিয়ে কেবল নামকেই অবলম্বন করে জীবন অতিবাহিত করাই এই বাণীর মূল শিক্ষণীয় বিষয়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বেদবাণী তৃতীয় খণ্ড

  বেদবাণী তৃতীয় খণ্ড বেদবাণী তৃতীয় খণ্ড বেদবাণী তৃতীয় খণ্ড, (১)নং পত্রাংশ। শ্রীশ্রী রামঠাকুর।  (১) স্বত:সিদ্ধ কাম পূর্ণ করিয়া সত্যনাথের অধীন হইয়া থাকিতে অভ্যাস করুন।  ন কর্ত্তৃত্বং ন কর্ম্মাণি লোকস্য সৃজতি প্রভু:।  ন কর্ম্ম ফলসংযোগ স্বভাবস্তু প্রবর্ত্ততে। ।  শ্রুতি বাক্য। স্ব স্ব ভাগ্যই ফল জন্মাইয়া থাকেন তাহা ছাড়া অন্য কাহারো ভাগ্য ফল দেবার ক্ষমতা নাই। যাহা হউক, আপনি সত্যের অংশে সকল ভার রাখি[য়া] সঙ্করের ঋণ সকল পরিশোধ করিতে যত্নবানের অভ্যাস করিতে থাকুন, সত্যই সকল ব্যবস্থা করিবেন।  ভাগ্যগতিকেই লোকে দেহ সমাজ স্বজন বন্ধুবান্ধব স্ত্রী পুত্রাদি এবং স্থানাদি লাভ করিয়া থাকে। যখন যাহা লোকের সংঘটন ঘটিয়া থাকে তাহার কর্ত্তা ভাগ্যই জানিবেন। স ভাগ্য ছাড়িয়া পরের ভাগ্যের অধীনে গেলে কালচক্রের অন্তের [?] অধীন হইয়া পড়িতে হয় জানিবেন।  বাড়ীঘর যেখানে হইবার হইবে-তাহা ভাগ্য অর্থাৎ ভগবানই বিধান করেন তাহার চিন্তা বৃথা। (ভাগ্যং ফলতি সর্ব্বত্র)সত্যনারায়ণকে ভুলিবেন না। watch Now বেদবাণী তৃতীয় খণ্ড, (২) নং পত্রাংশ। শ্রীশ্রী রামঠাকুর।   উৎ (আলোকে) সব (থাকা) দুই সখীগণে উৎসব...

"সর্ব্বতোভাবে সকল অবস্থায়ই সহিষ্ণুতার সঙ্গ করিতে চেষ্টা করিবেন।"

  📿 🌼 বেদবাণী (৯৭) | শ্রীশ্রী রামঠাকুর 🌼 "সর্ব্বতোভাবে সকল অবস্থায়ই সহিষ্ণুতার সঙ্গ করিতে চেষ্টা করিবেন।" সংসারের আবর্ত্তন নৃত্য সচরাচরে ভ্রমণ করিয়া থাকে। ইহাদের তরঙ্গ উল্লাসের বেগ যত সহ্য করিতে পারে, ততই ভগবৎ-শক্তিতে শান্তির শান্তিরথ খুলিয়া পড়ে। 🌊 সহিষ্ণুতা - এই একটি গুণই জীবনের সমস্ত ঝড় সামাল দিতে শেখায়। 🕊️ শান্তির পথ শুরু হয় সহ্য ও সংযম থেকে। 🙏 জয়গুরু | জয় ঠাকুর | জয় ভগবতী শক্তি 📌 Description (পোস্টের নিচে ব্যবহারযোগ্য) যে হৃদয়ে সহিষ্ণুতা, সেখানে ভগবানের শান্তি স্বয়ং এসে প্রবেশ করেন। ঠাকুর বলেছিলেন – সংসারের ঝড়, আনন্দ-বেদনার ঢেউ, সবকিছুই সহ্য করাই ঈশ্বর-প্রাপ্তির প্রথম ধাপ। আজকের দিনটিকে করুন ঠাকুরের ভাবনায় শুরু… 🔖 Hashtags
🌼 বেদবাণী (মূল উদ্ধৃতি) “সত্য = স্থায়ী (অক্ষর), অসত্য = অস্থায়ী (ক্ষর)। উপাধিতে আকৃষ্ট হইয়া লোক সমস্ত প্রকৃতিগত মন হইতে এই দ্বন্দ্ববিভাগের দাস হইয়া জন্ম-মৃত্যু-জরার দ্বারা বন্দী হইয়া পড়ে। যিনি গুণাতীত পরম ব্রহ্ম—যাঁহার জন্ম, মৃত্যু, জরা নাই—তাঁহাকে ভুলিয়া যায়। অতএব সর্বদা সত্যের ব্রত করিবেন। তিনি সর্ব্বকলুষময় ঋণদায় হইতে উদ্ধার করিয়া নিবেন। যাহা হউক, স্ব স্ব অধিকারের দাবী-দাওয়া না করিয়া সর্ব্বতোভাবে কর্ত্তব্য পালনে যত্নশীল হউন।” — শ্রী শ্রী রামঠাকুর বেদবাণী, ২য় খণ্ড (২৬) 🪔 সহজ ব্যাখ্যা (Explanation) 🔹 সত্য ও অসত্য ঠাকুর বলছেন— সত্য চিরস্থায়ী, অক্ষয়। অসত্য ক্ষণস্থায়ী, নশ্বর। 🔹 উপাধির মোহ নাম, পদ, অর্থ, মান-অপমান— এই সব উপাধিতে আসক্ত হয়েই মানুষ মন দিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এই দ্বন্দ্বই জন্ম দেয় জন্ম–মৃত্যু–জরার বন্ধন। 🔹 পরম সত্যকে বিস্মরণ এই মোহের কারণেই মানুষ ভুলে যায় সেই গুণাতীত পরম ব্রহ্মকে— যাঁর কোনো জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, জরা নেই। 🔹 উদ্ধারের পথ ঠাকুর নির্দেশ দিচ্ছেন— 👉 সর্বদা সত্যের ব্রত গ্রহণ করো 👉 অধিকার দাবি নয়, কর্তব্য পালন করো 👉 ফল বা প্র...